এম.মোরশেদ আলম :
মানুষের জীবনের প্রতিটি অর্জনের নেপথ্যে যে শারীরিক বা মানসিক প্রচেষ্টা তাই শ্রম। এটি উৎপাদনের প্রধান উপাদান এবং মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের অন্যতম মাধ্যম।
স্কটিশ দার্শনিক টমাস কার্লাইল বলেছেন, "শ্রমই জীবন"। অর্থাৎ, শ্রমিকের অন্তরের অন্তস্তল থেকে ঈশ্বরপ্রদত্ত শক্তির উদ্ভব হয়। শ্রমকে পবিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এর মাধ্যমেই বিশ্ব ও মানবসভ্যতা টিকে আছে।
কিন্তু বর্তমানে 'কাজ' বা 'শ্রম' শব্দটির সংজ্ঞায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন শ্রমিক মানে কেবল কলকারখানার নীল পোশাক পরা কর্মী নন। ফ্রিল্যান্সার, গিগ ইকোনমি ওয়ার্কার যেমন ডেলিভারি রাইডার বা রাইড শেয়ারিং চালক,এবং আইটি খাতের কর্মীরাও এই বিশাল শ্রমশক্তির অংশ।
১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারের শ্রমিকদের সেই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ আজো বিশ্বজুড়ে প্রতিটি কর্মজীবী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। 'আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা বিনোদন' এই দাবিতে যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, দেড়শ বছর পর ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় যুগে এসে সেই দাবির প্রাসঙ্গিকতা ভিন্ন এক মাত্রায় দাঁড়িয়েছে। আজকের মে দিবসে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে “প্রযুক্তির এই জয়যাত্রায় শ্রমিকের ঘাম আর মেধার কি যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে?”
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে 'ন্যূনতম মজুরি'র ধারণা থেকে বেরিয়ে 'জীবন ধারণের উপযোগী মজুরি' বা 'লিভিং ওয়েজ' নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন অসম্ভব। বিশেষ করে পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী খাতের নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সমমজুরি নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ফ্রিল্যান্সিং, রাইড শেয়ারিং বা ই-কমার্স ডেলিভারির মতো 'গিগ ইকোনমি'র প্রসার আমাদের কর্মসংস্থান বাড়ালেও শ্রমিকের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। এই খাতের কর্মীরা তথাকথিত 'মুক্ত পেশাজীবী' হিসেবে পরিচিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিমা, পেনশন বা নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
শ্রমিকের অধিকার কোনো দয়া বা অনুদান নয়, বরং এটি তাদের আইনি ও মানবিক প্রাপ্য। কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক পরিশোধের যে চিরায়ত দর্শন, তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতিতেও।
২০২৬ সালে আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অটোমেশন অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের বিকল্প হয়ে উঠছে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি যেন শ্রমিকের শত্রু না হয়। কলকারখানা থেকে শুরু করে করপোরেট অফিস পর্যন্ত—সর্বত্রই রোবটিক্স বা এআই-এর ব্যবহারের পাশাপাশি শ্রমিকের 'রি-স্কিলিং' বা পুনঃদক্ষতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকদের শ্রমের উপযুক্ত মর্যাদা সুনিশ্চিতকরণে কয়েকটি পরামর্শঃ
শ্রমিক হিসেবে নয় বরং মানুষ হিসেবে সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।
প্রযুক্তি যেন শ্রমিকের বিকল্প না হয়ে শ্রমিকের সহায়ক হয়, তা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে রোবট বা অ্যালগরিদম দিয়ে কাজ করানোর যুগে মানুষের সৃজনশীলতা এবং সংবেদনশীলতাকে ছোট করে না দেখা।
মেশিনের গতির সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে যেন মানুষের ‘মানবিক মর্যাদা’ ধূলিসাৎ না হয়।
মে দিবসের এই লগ্নে আধুনিক এই শ্রমশক্তির জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে বলা যায়, শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্কই একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। মে দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সুন্দর ও সমৃদ্ধ পৃথিবী গড়তে হলে শ্রমিকের হাতের কড়াকে সম্মান জানাতে হবে। এবারের মে দিবসের অঙ্গীকার হোক—প্রযুক্তির উৎকর্ষের সাথে সাথে শ্রমিকের মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তবেই সার্থক হবে শিকাগোর সেই শ্রমিকদের রক্তদান আর আমাদের প্রতি বছরের আনুষ্ঠানিক উদযাপন।
আজকের দিনে বিশ্বের সকল শ্রমজীবীদের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা। লেখক -শিক্ষক, সংগঠক ও বাচিক শিল্পী